খাসকামরায় ডেকে এসআইকে মারধরের অভিযোগ, বিচারককে আইন মন্ত্রণালয়ের শোকজ
নিজস্ব প্রতিবেদক
খাসকামরায় ডেকে নিয়ে ঢাকা রেলওয়ে থানার এক উপপরিদর্শককে (এসআই) মারধরের অভিযোগে ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১০-এর বিচারক শাহিদুল ইসলামের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, অসদাচরণ ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে কেন বিচারক শাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা সাত দিনের মধ্যে জানাতে বলা হয়েছে।
এর আগে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) ঘটনাটির বিচার চেয়ে জাতীয় সংসদ ভবনে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কামরুল হাসান তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম ডাবলুসহ পুলিশের ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। এ সময় ভুক্তভোগী ঢাকা রেলওয়ে থানার এসআই মোহাম্মদ আলীও উপস্থিত ছিলেন।
পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি দলটি আইনমন্ত্রীর কাছে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে বিচারক শাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়। মন্ত্রী বিষয়টি মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ ও পদ্মা সেতুগামী শহরতলী রেলওয়ের প্ল্যাটফর্মে দায়িত্ব পালন করছিলেন এসআই মোহাম্মদ আলী। ওই সময় নিরাপত্তা তল্লাশির অংশ হিসেবে ঢাকা অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১০ এর বিচারক শাহিদুল ইসলামের অফিস সহকারী সাকিব আল হাসানের ব্যাগ তল্লাশি করতে চান দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা।
পুলিশের অভিযোগ, সাকিব ব্যাগ তল্লাশিতে বাধা দেন এবং দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। একপর্যায়ে তাকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার জন্য রেলওয়ে থানায় নেওয়া হয়।
পুলিশ জানায়, থানায় প্রথমে নিজের পরিচয় না দিলেও পরে সাকিব নিজেকে আদালতের পিয়ন হিসেবে পরিচয় দেন। মোবাইল ফোনে বিচারকের সঙ্গে কথা বলে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিষয়টির নিষ্পত্তি করা হয়।
তবে এসআই মোহাম্মদ আলীর অভিযোগ, থানা থেকে বের হওয়ার সময় সাকিব তাকে আদালতে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। পরে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়ে ঢাকা রেলওয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তিনি। এরপর গত ৩১ আগস্ট এসআই মোহাম্মদ আলীকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মাধ্যমে তলব করেন ঢাকা রেলওয়ে থানার আমলী আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলাম সোহাগ। অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে তাকে ঢাকা অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১০-এর বিচারকের সঙ্গে বিষয়টি মীমাংসা করে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পরে গত মঙ্গলবার দুপুরে বিচারক শাহিদুল ইসলামের আদালতে গেলে তাকে খাসকামরায় নিয়ে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন এসআই মোহাম্মদ আলী।
লিখিত অভিযোগে তিনি বলেন, আদালতের কক্ষে আগে থেকেই একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি মোবাইল ফোন হাতে বসেছিলেন। পরে বিচারকের স্টাফসহ মোট তিনজন সেখানে অবস্থান নেন এবং দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে আদালতের ওমেদার হিসেবে পরিচিত একজন পেছন থেকে তাকে আঘাত করে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। ঘটনার সময় একজন ব্যক্তি পুরো বিষয়টি মোবাইল ফোনে ধারণ করেন বলেও অভিযোগ করেন এসআই মোহাম্মদ আলী।
তার আরও অভিযোগ, বিচারক এ সময় তাকে ‘তুই-তামারি’ করে ধমক দেন। নিজের কোনো আচরণে বিচারক ক্ষুব্ধ হয়ে থাকলে তিনি ক্ষমা চাইতেও প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু বিচারক বিষয়টি আমলে না নিয়ে তার পিয়ন সাকিব আল হাসানের বক্তব্যের ভিত্তিতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে মারধর ও অপমান করিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে পুলিশের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আদালতের পিয়ন সাকিব আল হাসান। তার দাবি, কমলাপুরে ট্রেন থেকে নামার সময় একজন কনস্টেবলসহ কয়েকজন তার কাঁধে থাকা ব্যাগে হাত দেন। তিনি তাদের সামনে ব্যাগ তল্লাশির অনুরোধ করেন। পরে নিজেকে আদালতের স্টাফ হিসেবে পরিচয় দিলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সাকিবের অভিযোগ, বিষয়টি জানাতে রেলওয়ে থানায় গেলে এসআই মোহাম্মদ আলী তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে চড়-থাপ্পড় মারেন। এ সময় বিচারকের সঙ্গে ফোনে খারাপ ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ ঘটনার পর বিচারাঙ্গণ ও পুলিশ প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে আইনমন্ত্রীর কাছে বিচার চাওয়া এবং পরে বিচারকের কাছে আইন মন্ত্রণালয়ের শোকজ নোটিশ দেওয়ার ঘটনা সামনে এলো।